কক্সবাজারের টেকনাফে সীমান্ত পেরিয়ে আসা গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছে নয় বছর বয়সী শিশু হুজাইফা আফনান। বর্তমানে সে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছে। রোববার (১১ জানুয়ারি) সকালে দাদার সঙ্গে দোকান থেকে নাস্তা কিনে ফেরার সময় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
ঘটনাটি ঘটে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল গ্রামের তেচ্ছা ব্রিজ এলাকায়। আহত হুজাইফা আফনান ওই গ্রামের জসিম উদ্দিনের কন্যা এবং স্থানীয় হাজি মোহাম্মদ হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই প্রথমে শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে পরে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শাহজালাল এ তথ্য ভুল বলে নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, শিশুটি জীবিত রয়েছে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাসও জানান, গুলিবিদ্ধ হলেও শিশুটি মারা যায়নি।
রোববার বিকেলে হুজাইফার চাচা শওকত আলী তাকে টেকনাফ থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। রাতে হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, শিশুটির শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান হারুনুর রশীদ জানান, হুজাইফার মুখের ডান পাশ দিয়ে গুলি প্রবেশ করেছে এবং তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।
হুজাইফাদের বাড়ি সীমান্তসংলগ্ন লম্বাবিল গ্রামের তেচ্ছা বিল এলাকায়। সেখানে প্রায় দুই শতাধিক পরিবার বসবাস করে। শিশুটির চাচা শওকত আলী জানান, গত তিন দিন ধরে মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে গোলাগুলি চলছিল। তাদের বাড়ি থেকে সীমান্তের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার।
তিনি আরও বলেন, শনিবার রাতভর গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে এবং রোববার সকালে কুয়াশার মধ্যেই গুলির শব্দ আরও তীব্র হয়। একপর্যায়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সীমান্ত এলাকা থেকে আরাকান আর্মির সদস্যরা আরসার সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে গুলি করতে করতে বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে আসে। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় সকাল থেকেই শিশুদের ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি।
শওকত আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, তার বড় ভাইয়ের মেয়ে হুজাইফা দাদার সঙ্গে নাস্তা কিনতে দোকানে যায়। ফেরার পথে হঠাৎ সীমান্ত থেকে ছুটে আসা একটি গুলি তার শরীরে লাগে। নাস্তা নিয়েই তারা আর বাড়ি ফিরতে পারেননি।
হুজাইফার বাবা জসিম উদ্দিন পেশায় মাছ ব্যবসায়ী। তিন সন্তানের মধ্যে হুজাইফা সবার বড়। তাদের পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে ওই সীমান্ত এলাকায় বসবাস করে আসছে। সীমান্ত ও বসতবাড়ির মাঝামাঝি এলাকায় স্থানীয়রা মাছ চাষ করে এবং একটি ছোট খাল বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে আলাদা করেছে। গোলাগুলির সময় এলাকায় বিজিবির কোনো সদস্য চোখে পড়েনি বলেও জানান স্বজনরা।
ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী কক্সবাজার–টেকনাফ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ খোকন কান্তি রুদ্র জানান, সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)-র মধ্যে টানা তিন দিন ধরে ভয়াবহ সংঘর্ষ চলছে। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাতেও, যার ফলে স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।