নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে যুক্ত হতে যাচ্ছে এক ব্যতিক্রমী ও ঐতিহাসিক অধ্যায়। ডেমোক্র্যাট নেতা জোহরান মামদানি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি শহরের মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন। এর মাধ্যমে তিনি হবেন নিউইয়র্কের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম, প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং আফ্রিকা বংশোদ্ভূত প্রথম মেয়র। এই ঘটনা শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়, বরং শহরটির বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক শক্তিশালী প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
নতুন বছরের শুরুতে মামদানি দুটি আলাদা শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। একটি হবে সীমিত পরিসরে, ব্যক্তিগত ও প্রতীকী আয়োজন হিসেবে, আর অন্যটি অনুষ্ঠিত হবে জনসমক্ষে সিটি হলে। উভয় অনুষ্ঠানেই তিনি ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কুরআনের ওপর হাত রেখে শপথ নেবেন যা নিউইয়র্কের কোনো মেয়রের ক্ষেত্রে এই প্রথম। বিশ্লেষকদের মতে, এটি তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশের পাশাপাশি শহরের মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি সম্মান ও সংহতির বার্তা বহন করছে।
বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে শপথ গ্রহণে ব্যবহৃত কুরআনগুলো। এই আয়োজনে মোট তিনটি কুরআন ব্যবহার করবেন জোহরান মামদানি। নিউইয়র্কের পরিত্যক্ত সাবওয়ে স্টেশনে অনুষ্ঠিত বিশেষ অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে থাকবে দুটি কুরআন একটি তাঁর দাদার ব্যক্তিগত কপি এবং অন্যটি আঠারো শতকের শেষভাগ বা উনিশ শতকের শুরুর দিকের একটি ক্ষুদ্রাকৃতির ‘পকেট কুরআন’। ঐতিহাসিক এই কুরআনটি নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির শমবার্গ সেন্টার ফর রিসার্চ ইন ব্ল্যাক কালচারের সংগ্রহ থেকে নেওয়া হচ্ছে। সিটি হলে অনুষ্ঠিত প্রকাশ্য শপথ অনুষ্ঠানে তিনি দাদু-দাদির উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কুরআনের ওপর হাত রাখবেন।
এই ঐতিহাসিক কুরআন সংগ্রহের পেছনে রয়েছে গভীর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য। শমবার্গ সেন্টারের কুরআনটি সংগ্রহ করেছিলেন প্রখ্যাত অ্যাফ্রো-ল্যাটিনো লেখক ও ইতিহাসবিদ আর্তুরো শমবার্গ। পুয়ের্তো রিকোতে জন্ম নেওয়া শমবার্গ হারলেম রেনেসাঁস আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি নির্মাতা হিসেবে পরিচিত। তিনি মুসলিম ছিলেন না, তবে আফ্রিকান ও আফ্রিকান-আমেরিকানদের ইতিহাস, শিল্প ও ধর্মের পূর্ণ চিত্র তুলে ধরতেই নিজের সংগ্রহে কুরআন অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। এটি ছিল তাঁর শৈশবের এক শিক্ষকের সেই দাবির প্রতিবাদ যেখানে বলা হয়েছিল আফ্রিকানদের কোনো উল্লেখযোগ্য ইতিহাস নেই।
শমবার্গের সংগ্রহে থাকা এই কুরআনটি অটোমান সিরিয়া থেকে সংগৃহীত এবং দৈনন্দিন পাঠের জন্য তৈরি হয়েছিল। এর লিপি ও বাঁধাই সেই সময়ের ধর্মীয় জীবনের সাক্ষ্য বহন করে। শপথ গ্রহণের পরদিন এই কুরআনটি নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরিতে একটি বিশেষ প্রদর্শনীতে জনসমক্ষে প্রদর্শিত হবে, যা শমবার্গ সেন্টারের শতবর্ষ উদ্যাপনের অংশ।
আইন অনুযায়ী নিউইয়র্কে শপথ গ্রহণের সময় কোনো ধর্মগ্রন্থে হাত রাখা বাধ্যতামূলক নয়। তবুও ঐতিহ্যগতভাবে শহরের অধিকাংশ মেয়র বাইবেলের ওপর হাত রেখে শপথ নিয়েছেন। অতীতে এরিক অ্যাডামস তাঁর মায়ের বাইবেল ব্যবহার করেছিলেন, আর বিল ডি ব্লাসিও শপথ নিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের বাইবেলের ওপর হাত রেখে। সেই ধারাবাহিকতায় মামদানির সিদ্ধান্ত এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, ভাড়ানীতি সংস্কার এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষার মতো বিষয়কে গুরুত্ব দিলেও জোহরান মামদানি নিজের মুসলিম পরিচয় নিয়েও সবসময় প্রকাশ্য ছিলেন। পাঁচটি বরোর বিভিন্ন মসজিদে নিয়মিত উপস্থিত হয়ে তিনি একটি শক্তিশালী জনসমর্থন গড়ে তোলেন। এই সমর্থকদের বড় অংশই ছিলেন প্রথমবার ভোট দেওয়া দক্ষিণ এশীয় ও মুসলিম ভোটার।
শপথ অনুষ্ঠানের জন্য ঐতিহাসিক কুরআন নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় মামদানির স্ত্রী রমা দুয়াজির সঙ্গে কাজ করেছেন গবেষক ও কিউরেটররা। তাঁদের মতে, এই আয়োজন নিউইয়র্কের নাগরিক ইতিহাসে মুসলিমদের দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতিকে দৃশ্যমানভাবে সংশোধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
সব মিলিয়ে, জোহরান মামদানির শপথ গ্রহণ শুধু একজন নতুন মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ নয়; এটি নিউইয়র্কের মতো বৈচিত্র্যময় শহরে ধর্মীয় সহনশীলতা, প্রতিনিধিত্ব এবং অন্তর্ভুক্তির এক শক্তিশালী প্রতীক। এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণে অনুপ্রাণিত করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।