
‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম’ ইতালি দখলের পর রোমে এই উক্তি করেছিলেন জুলিয়াস সীজার। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ক্ষেত্রে যেন তেমনটি ঘটলো। ১৭ বছর বিদেশে থেকে দেশে প্রত্যাবর্তনের মধ্যদিয়ে ‘ঢাকায় এলাম, বক্তৃতা দিলাম, সবার মন জয় করলাম’। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে তারেক রহমানের গণসংবর্ধনার ভাষণ এখন দেশজুড়ে আলোচনার শীর্ষে। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে রাজনীতি, গণতন্ত্র, নির্বাচন, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ এবং সবাইকে নিয়ে দেশ পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। রাজনীতিতে ভিন্ন ভিন্ন মত বিদ্যমান থাকলেও দলমত নির্বিশেষে তিনি এখন সবার নেতা। তারেক রহমান মানে বিএনপি, দেশের ঐক্যের পরিচ্ছন্ন রাজনীতি। জুলিয়াস সীজার রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে ইতালি দখল করেন; আর তারেক রহমান বক্তৃতা দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। বিএনপির নেতা হয়েও তিনি মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, পাহাড়ি, সমতল সব অঞ্চল এবং ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি পেশার মানুষকে নিয়ে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণা দিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি।’ একইসঙ্গে তিনি দেশবাসীর কাছে আগামীর পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, ‘নবী (সা.) ন্যায় পরায়ণতার আদলে দেশ গড়বো’। তারেক রহমানের সর্বময় গ্রহণযোগ্য এই বার্তা বিদ্যুৎবেগে ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে হাটে-মাঠে-ঘাটে, সোশ্যাল মিডিয়া সর্বত্রই সাড়া পড়ে। সবার মুখে তারেক রহমানের জয়ধ্বনি। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের ১৬ মিনিট তিনি সরাসরি বক্তৃতা করেন। বক্তৃতায় তার ভাষা, শব্দচয়ন, বডি ল্যাঙ্গুয়েজে প্রকাশ পায় তিনি গণমানুষের নেতা। কয়েক কিলোমিটারব্যাপী জনতার উপস্থিতিতে দেয়া বক্তৃতায় তিনি কয়েকবার ‘আল্লাহ’ নাম উচ্চারণ করেন। গণমাধ্যমের খবর প্রকাশ পেয়েছে, ফেসবুক এবং ইউটিউব মিলিয়ে তারেক রহমানের বক্তব্যে মোট ৩০ কোটি ভিউ হয়েছে। এর মধ্যে ফেসবুকে ৭৫ শতাংশ এবং ইউটিউবে ৩০ শতাংশ। এনালিটিক্স বলছে, তারেক রহমানের বক্তৃতার সময় সর্বোচ্চ দর্শক ছিল প্রায় দুই কোটি। এক বক্তৃতায় তিনি ‘সকলের তারেক রহমান’ হয়ে উঠেছেন। সাধারণ মানুষ তো বটেই; বছরের পর বছর ধরে যারা তার বিরুদ্ধে বিষোদগার করে প্রচারণা চালিয়েছেন; রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে তার অনিষ্ট কামনা করতেন এবং তারেক রহমান দেশে ফিরবে না এমন অপপ্রচারে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছেন; তারাও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের এক বক্তৃতায় তার অনুসারী হয়ে উঠেছেন। তিনি কার্যত হয়ে উঠেছেন দেশের রাজনীতির জাদুকর।
দেশের মানুষ দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ ধরে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত। হত্যা, গুম, খুন আর জুলুম নির্যাতনে জর্জরিত। পৈশাচিক জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে জুলাই অভ্যুত্থানে ১৪শ’ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিস্টকে ক্ষমতাচ্যুত করে ভোটের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে। নির্বাচনী ট্রেন চলতে শুরু করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরও দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীরা নির্বাচন ভ-ুলের ষড়যন্ত্রে তৎপর; নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের লম্বা হাত যখন অন্তর্বর্তী সরকার পর্যন্ত পৌঁছে গেছে; এমননি সময় স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে তারেক রহমান দেশবাসীকে নতুন অভয় বার্তা দেন। দিকনির্দেশনামূলক সময়োপযোগী তার বক্তৃতার দ্যুতি দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। নির্বাচনের আগেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো তাকে আগামীর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিহিত করেছে। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে নির্যাতিত, নিপীড়িত, গণতান্ত্রিক অধিকারহারা মানুষের কাছে তার এই বার্তা (বক্তৃতা) অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করেছে। এখন তারেক রহমান মানেই যেন বাংলাদেশের রাজনীতির অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি যেন অধিকার বঞ্চিত মানুষের মুক্তি দূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সব মতপথের সবাইকে নিয়ে নিয়ে আগামীতে দেশ গঠনের বার্তা দেয়ায় সবাই এখন তার দিকে তাকিয়ে। তার উপর নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও রাজনীতির গতিপ্রকৃতি।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে দেশ ছাড়লেও মহানায়কের বেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন। ল-ন থেকে তিনি দেশে ফিরে আসায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের ধোঁয়াশা আকাশ-বাতাসে উড়ছিল তা মুহূর্তেই কেটে গেছে। তিনি যেখানেই যাচ্ছেন দলমত নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ তাকে অনুসরণ করছে। একনজর দেখার জন্য পথে প্রান্তরে ৫ ঘণ্টা, ১০ ঘণ্টা রাস্তায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকছে হাজারো মানুষ। গত ২৫ ডিসেম্বর রাজধানীর তিনশ’ ফিটে সংবর্ধনায় বক্তৃতার পর এভারকেয়ার হাসপাতালে যান মা অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে। সেখানেও হাজার হাজার মানুষ তাকে এক নজর দেখার জন্য ভিড় করেন। গত ২৬ ডিসেম্বর পিতা বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের করব জিয়ারত করতে যান; সেখানে ৫ ঘণ্টা-১০ ঘণ্টা ধরে হাজার হাজার মানুষ তাকে একনজর দেখার জন্য অপেক্ষা করেন। অতঃপর রাতে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যান একাত্তুরের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে; সেখানে কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হন প্রিয় নেতাকে এক নজর দেখতে। এমনকি শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এবং অতঃপর সেখান থেকে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে আগারগাঁওস্থ নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে যান। সেখানেও হাজার হাজার মানুষ তাকে এক নজর দেখার জন্য ভিড় করেন। তাকে দেখতে আসা উৎসুক জনতার ভিড় ঠেকাতে শীতের দিনেও আইন শৃংখলা বাহিনীকে রীতিমতো ঘাম ঝরাতে হয়। ১৭ বছর বিদেশ থেকে ফিরে এসে এমন বাণী দেশবাসীকে শুনিয়েছেন যে তিনি দেশের ভোটাধিকার হারা মানুষের কাছে হয়ে উঠেছেন জার্মানির হ্যামিলন শহরের বিখ্যাত লোককাহিনীর সেই বাঁশিওয়ালার মতোই অবিসম্বাদিত নেতা।
বাংলাদেশের রাজনীতি কার্যত হিংসা-বিদ্বেষ আর প্রতিহিংসার রাজনীতির চারণভূমি। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ দেশে মাফিয়াতন্ত্র কায়েমের মাধ্যমে প্রতিটি সেক্টরকে কব্জা করে নিয়েছিল। রাজনীতির নামে ঘৃণার চর্চা হতো সব সময়। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট বাহিনী ক্ষমতার বিষ্ঠা ও উচ্ছিষ্ট ছড়িয়ে গণমাধ্যম থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিসেবীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিল। সে সিন্ডিকেটের কাজই ছিল বিএনপি বিশেষ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা আর অপপ্রচার চালানো। এমন অপকা-ের অস্ত্র নেই তারা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেননি। আবার তারেক রহমান মধ্যপন্থী রাজনীতিক তথা জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী হওয়ায় ফ্যাসিস্টপন্থী উগ্র প্রগতিশীলদের বিপরীতে তথাকথিত ইসলামী ধারার রাজনৈতিক দলও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছে। তারা নিজেদের একমাত্র ইসলামের ধারক-বাহক হিসেবে প্রচার করেছে। এমনকি তাদের মার্কায় ভোট দিয়ে পরকালের বেহেস্ত নিশ্চিত করার প্রচারণা চালিয়েছে। তথাকথিত প্রগতিশীল এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের তাবেদার গণমাধ্যম ও ব্যক্তিত্বরা যেমন তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতিবাজ, টাকা পাচারকারী ইত্যাদি ন্যারেটিভ দিয়ে অপপ্রচার করেছে; তেমনি মুসলমানদের বেহেস্তে নেয়ার ইসলামী ধারার ব্যাপারীরা উগ্রভাবে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ‘ইসলামপন্থী নয় এবং আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে’ এমন প্রচারণা চালিয়েছে। কিন্তু গণসংবর্ধনায় তারেক রহমান বক্তৃতায় যেভাবে কয়েকবার আল্লাহর নাম স্মরণ করে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ক্ষমতায় গেলে মহানবী (সা.) ন্যায় পরায়ণতার আদলে দেশ গড়ার বার্তা দেন; তাতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগপন্থী এবং অতি ডান তথা ইসলামপন্থী বেহেস্তের নিশ্চয়তা দেয়া রাজনৈতিক দলের নেতাদের মুখে ছাই পড়েছে। তারেক রহমানের অবিস্মরণীয় বক্তৃতায় দেশের ডান, বাম, মধ্যপন্থী রাজনীতিক থেকে শুরু করে তরুণ, জেনজি, নারী, আলেম-ওলামা, পাহাড়, সমতলসহ সব শ্রেণি পেশার মানুষ বিমোহিত। এমনকি প্রশাসনে যারা বিগত আওয়ামী লীগের অলিগার্ক হিসেবে পরিচিত সেই আমলারা তারেকের পিছনে জনস্রোত দেখে বিমোহিত হয়ে তারেক বন্দনা করছেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে রাখা কিছু আমলা দাঁড়িপাল্লা ও হাতপাখায় ভোট দিলে ‘বেহেস্তের টিকেট’ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া নেতারা তারেকের বিরুদ্ধে রয়ে গেছেন। তবে তাদের কেউ কেউ তারেকের জাদুকরী বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে অনুসারী হয়ে গেছেন। মূলত এক বক্তৃতায় তারেক রহমান সবার হৃদয় জয় করে নিয়েছেন। যার কারণে তারেক রহমান যেদিকে যান; সেদিকে ছুটছে মানুষ। প্রিয় নেতাকে এক নজর দেখার জন্য সবাই উদগ্রীব। দেশের ক্রান্তিকালে সময়ের প্রয়োজনেই আল্লাহ যেন তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছেন। দেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানের প্রতিপক্ষ রয়েছে। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে দেশ গড়ার ডাক দিয়ে তিনি দেশের রাজনীতির গতিধারাই পাল্টে দিয়েছেন। দেশে দেশে যুগে যুগে এমন কিছু নেতার আবির্ভাব ঘটেছে, যাদের সুচিন্তিত নেতৃত্বে সমগ্র দেশকে আলোকিত হয়েছে। তাদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, নেতৃত্ব দেশের গতিপথ বদলে দিয়েছে। তারেক রহমানের আবির্ভাব ঘটেছে তেমনি ভাবেই। তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করায় নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা কেটে গেছে। তিনি বাংলাদেশের মানুষকে নতুন বাংলাদেশ উপহার দেবেন সে প্রত্যাশায় আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন মানুষ।





